কিংবদন্তী লালনসংগীত শিল্পী ফরিদা পারভীন আর নেই। বাংলাদেশের লোকসংগীত হারালো অমূল্য রত্ন।
ঢাকা, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের লালনসংগীতের অনন্য কণ্ঠশিল্পী, একুশে পদকপ্রাপ্ত ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী ফরিদা পারভীন আর নেই। শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর মহাখালীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭১ বছর।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন এবং নিয়মিত ডায়ালাইসিস নিচ্ছিলেন। সম্প্রতি শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকদিন আইসিইউতে থাকার পর অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান।
শৈশব ও বেড়ে ওঠা।
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন ফরিদা পারভীন। শৈশব কেটেছে কুষ্টিয়ায়। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল। সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলেন স্থানীয় ওস্তাদদের কাছ থেকে। ছাত্রজীবনেই তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গেয়ে খ্যাতি অর্জন করেন।
সংগীতযাত্রার সূচনা।
১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারে নজরুলসংগীত গেয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। প্রথমদিকে আধুনিক গান ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করলেও পরবর্তীতে সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করেন লালনশাহের গান পরিবেশনে।
ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনের গান নতুন প্রাণ পেয়েছিল। তাঁর গায়কী ভঙ্গিতে ছিল সহজ-সরল আবেগ, দার্শনিক ভাব ও মানুষের অন্তর্গত ভালোবাসার অনুরণন। এ কারণেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের “লালনকন্যা”।
জনপ্রিয় গান ও অবদান
তাঁর কণ্ঠে অসংখ্য লালনগীতি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। যেমন—
সত্য বল সুপথে চল
নিন্দার কাঁটা যদি
শত শত জনম ভেসে এলাম তোমার সনে
তোমরা ভুলে গেছ মালিকাদের নাম
তাঁর গান শুধু সংগীতানুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ ছিল না; বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার ও আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি সমান দক্ষতায় পরিবেশন করেছেন। তাঁর গাওয়া লালনগীতি বিশ্বের নানা প্রান্তে বাংলাদেশকে পরিচিত করেছে।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি।
ফরিদা পারভীনের দীর্ঘ সংগীতজীবনে অর্জিত পুরস্কারের তালিকাও সমৃদ্ধ।
একুশে পদক (১৯৮৭)
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩, সেরা নারী কণ্ঠশিল্পী)
ফুকুওকা এশিয়ান কালচার প্রাইজ (২০০৮, জাপান)
এছাড়াও দেশে-বিদেশে অসংখ্য স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।
শিল্পী ও সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রতিক্রিয়া
ফরিদা পারভীনের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পী, সংগীতজ্ঞ ও সংস্কৃতি কর্মীরা। তাঁদের ভাষ্যে—
“তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন বাংলার আধ্যাত্মিক সংগীতের দূত।”
“লালনের গানকে তিনি বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাকে অমর করে রাখবে।”
“বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন এক অপূরণীয় ক্ষতি বরণ করল।”
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা
ফরিদা পারভীন ছিলেন নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক আলোকবর্তিকা। তাঁর সরল জীবনধারা, গভীর অধ্যবসায় এবং সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা নতুন শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফরিদা পারভীনের গাওয়া গানগুলো আগামী প্রজন্মের জন্য এক ধ্রুপদী সম্পদ হয়ে থাকবে। লালনশাহের গানকে তিনি যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
উপসংহার
কিংবদন্তী লালনসংগীত শিল্পী ফরিদা পারভীনের মৃত্যুতে পুরো জাতি শোকাহত। তবে তাঁর রেখে যাওয়া গান, দর্শন ও মানবিক বার্তা বাঙালি সংস্কৃতিতে চিরজাগরূক থাকবে। মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হলো এক জীবনের অধ্যায়, কিন্তু শুরু হলো এক অমর স্মৃতির যাত্রা।
গাজীপুর নিউজ 24
আপনাদের যে কোনো নিউজ, বিজ্ঞাপন ও মতামত জানাতে যোগাযোগ করুন-
মোবাইল: 01913-891217 Email:- gazipurnews24bd.com@gmail.com
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫ www.gazipurnews24bd.com