
গাজীপুর: ইতিহাসের গর্ব — সমরাস্ত্র কারখানা ও টাকশাল
গাজীপুর—ঢাকার পাশের সেই জেলা, যেখানে প্রতিরক্ষার কঠিন ভীতির কথা বলার সুযোগ পায়, এবং যেখানে অর্থনীতির স্পন্দনে দেশের টাকা-মুদ্রণ ও অস্ত্র-উৎপাদন গড়ে ওঠে। গাজীপুর সেই স্বপ্নের জায়গা, যেখানে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা ও টাকশাল একসঙ্গে কাজ করে দেশকে সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্ব্যের পথে এগিয়ে নিতে।
১. বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা (Bangladesh Ordnance Factories, BOF)
🔹 অবস্থান ও ইতিহাস
গাজীপুর জেলার চতর মৌজায় প্রায় ৩০২-৩০৩ একর জমিতে অবস্থিত এই কারখানা।
প্রতিষ্ঠা শুরু হয় ১৯৬৮-৬৯ সালে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়কতায়; আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ৬ এপ্রিল ১৯৭০ এ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় (১৯৭১) কিছু ধ্বংস শেষে তারপরে পুনরায় সক্ষম করা ও প্রসারিত করা হয়েছে।
🔹 দায়িত্ব ও কাজের পরিধি
কারখানা হ্যান্ডেল করে ক্ষুদ্র অস্ত্র, ক্ষুদ্র অস্ত্র গোলাবারুদ, ক্যামান গোলাবারুদ, গ্রেনেড ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও উৎপাদন।
এটি বাংলাদেশের একমাত্র বড় ধরনের সমরাস্ত্র উৎপাদনকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান, যা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ করে।
🔹 অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব
এই কারখানা রয়েছে সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, এবং পরোক্ষভাবে নিরাপত্তা খাতে বিদেশী অংশীদারিত্ব ও প্রযুক্তি বর্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিরক্ষা নির্ভরতায় বিদেশ থেকে আমদানির খরচ কমিয়ে আনা, দেশকে স্বনির্ভর করার পথে এটি একটি বড় ধাপ।
২. টাকশাল (দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন, বাংলাদেশ লিমিটেড)
🔹 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও ইতিহাস
সাধারণভাবে “টাকশাল” নামে পরিচিত, পোশাকি নাম দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড।
আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে টাকা ছাপানোর উদ্দেশ্যে।
পূর্বে এটি ছিলেন একটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকল্প; পরে ১৯৯২ সালে স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে গঠন করা হয়।
🔹 কাজ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বাংলাদেশে সব “নোট” বা ব্যাংকনোট উক্ত ছাপাখানায় ছাপা হয়।
শুধু টাকা নয়, নিরাপত্তাসংলগ্ন বায়োমেট্রিক, স্ট্যাম্প, স্মারক ডাকটিকিট, সার্টিফিকেট, নির্দিষ্ট সরকারি কাগজপত্র ও শিক্ষা বোর্ডের নম্বরপত্র ও সনদ এগুলো ছাপানো হয় এখানে।
অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা বজায় রাখা হয় – প্রবেশ পথে দেহতল্লাশি, কর্মী ও কর্মকর্তাদের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন স্টেশন ও প্রক্রিয়ায় পাস বা অনুমোদন ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ।
🔹 প্রযুক্তি ও কার্যপ্রণালি
নোট ছাপাতে প্রায় ৩০টি ধাপে কাজ করতে হয়।
নতুন নোট ছাড়াও পুরাতন নোট / ব্যবহৃত নোট গুলো মূল্যমান, অবস্থা ইত্যাদি বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট ও অন্যান্য ব্যাংকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে আসে।
✅ উপসংহার
গাজীপুর শুধু শিল্প নগরী নয়, দেশের প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভ্যুদয়ের জায়গা।
সমরাস্ত্র কারখানা দেশকে সুরক্ষায় আত্মনির্ভর হবার সুযোগ তৈরি করেছে; বিদেশ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারু আমদানির উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে সহায়ক।
টাকশাল অর্থনৈতিক ও আর্থনৈতিক নীতি-পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, যার কারণে দেশের মুদ্রণ ও নিরাপত্তা ছাপাখানা সম্পর্কিত কাজ দেশের মধ্যেই হচ্ছে, এবং প্রচুর পরিমাণে বিদেশি খরচ বাঁচছে।